কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোথায় কি কাজে লাগে বিস্তারিত।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার হল এমন একটা কম্পিউটার যেটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিভিন্ন ধর্মকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে সব কাজ করে। কোয়ান্টাম লেভেলের কণিকায় তথ‍্য সংরক্ষণ করা যায়, এদেরকে বলা হয় কোয়ান্টাম ইনফরমেশন। এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট, টেলিপোর্টেশন, সুপারপজিশন ইত‍্যাদি ধর্ম ব‍্যবহার করে তথ‍্য আদান-প্রদান, হিসাব নিকাশ করা সম্ভব। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সব গণনা এভাবেই করা হয়।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ধারণা কাজে লাগিয়ে সুপার কম্পিউটার থেকেও শক্তিশালী যে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে তাকে সাইন্টিস্টরা বলছেন কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এমন অনেক কাজ করা যায় যেগুলো সাধারণ কম্পিউটারে করা যায় না। ১৯৯৯ সালে লস অ্যালোমাস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির আইজাক চুয়াং, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) নীল গের্শেনফেল্ড এবং বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক কুবিনেক প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটার (২-কোবিট) তৈরি করেছিলেন যা ডেটা সহ লোড হতে পারে এবং একটি সমাধান আউটপুট। কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোন সাধারণ কম্পিউটার না যা আমরা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে থাকি। সাধারণ কম্পিউটারের কাজ করে বাইনারি ডিজিট ০ আর ১ নিয়ে কিন্তু,কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করে ০ কিংবা ১ এর সম্ভাবনা নিয়ে। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে এতে সুবিধা কি! সুবিধা আছে। সাধারন কম্পিউটারের ক্ষেত্রে ০ বা ১ এ দুটি সম্ভাব্য ফলাফল থাকে,কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর ক্ষেত্রে এ দুটি ঘটনার মাঝামাঝি অবস্থা নিয়েও কাজ করা যাবে। এনটেঙ্গেলমেন্ট, সুপারপজিশন এইসব ধারণা প্রয়োগ করা হয় এই কম্পিউটারে। সাধারন বিটের ধারনার বদলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ব্যাবহার করা হচ্ছে Qbit

এটি এমন একটি কম্পিউটার যা পৃথিবীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম কোড ভাঙতে পারে, নতুন মেডিসিনের নকশা করতে পারে এবং হাজারো কম্পিউটারের কাজ একাই মুহূর্তে করতে পারে।

গুগোল, আইবিএম, মাইক্রোসফট এর মত বড় বড় কোম্পানি অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এ সাফল্য পেতে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সব হিসাব-নিকাশ “কিউবিট” এর মাধ্যমে করা হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্যের একক হলো “কিউবিট”।

এই “কিউবিট” একটা ফোটন কণিকা, ইলেক্ট্রন কণিকা, ডায়মন্ড বা অন্য যেকোনো কিছুর কণিকা হতে পারে। এসব কণিকা তথ্য সংরক্ষণ করতে ও বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করতে ব্যবহার করা যায়।

বিজ্ঞানীদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে আগ্রহী হওয়ার মূল কারণ ছিল- কোয়ান্টাম ইনফরমেশন ব্যবহার করে এমন অনেক কাজ করা যায় যা সাধারণ কম্পিউটার দিয়ে করা অসম্ভব ছিল।

তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্পর্কিত বাস্তবতা হলো এটি প্রাইম ফ্যাক্টোরাইজেশনের মত কাজ খুব দ্রুত করতে পারলেও কিছু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় খুব একটা ভালো পারফরমেন্স করতে পারে না।কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন এর ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে সাধারণ কম্পিউটারের কখনোই পাওয়া সম্ভব না। সাধারণ কম্পিউটারে যে ধরণের এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশী নিরাপদ হচ্ছে গিয়ে কোয়ান্টাম এনক্রিপশন পদ্ধতি। জটিল অনেক হিসাব অনেক সহজে করে ফেলা সম্ভব এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে কল্পনাতিত পরিবর্তন আনবে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার । গুগল ইতিমধ্যে চালকবিহীন গাড়ির সফ্টওয়্যার উন্নত করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার রাসায়নিক বিক্রিয়ার মডেলিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যেখানে সুপার কম্পিউটারগুলো কেবলমাত্র প্রাথমিক অণু বিশ্লেষণ করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা আশা করেন কোয়ান্টাম সিমুলেশন এর মাধ্যমে এমনকি আলঝাইমার নিরাময়ের ঔষধের সন্ধানও পাওয়া যেতে পারে। শেয়ার বাজারের দর-পতন প্রেডিকশান দেওয়া,ইলেক্ট্রনের আচরণের মডেলিং করা অর্থাৎ কোয়ান্টাম ফিজিক্স বোঝার জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্যবহার করা যেতে পারে।ক্রিপ্টোগ্রাফি বা হিডেন কোড বের করতেও কাজে লাগবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।ক্লাসিকাল কম্পিউটারগুলির জন্য কোন পাসওয়ার্ড বের করে আনা সময় সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং কঠিন, তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলি এটি সহজেই করতে পারে। তবে এর ফলে আমাদের সকল ডেটা ঝুঁকিতে পরবে।বলা হয়ে থাকে মোসাদের মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে এই বিপুল পরিমাণ পাসওয়ার্ড দেয়া সাংকেতিক ভাষায় লেখা ডেটা স্ন্যাচ করছে যেন তারা কোয়ান্টাম কম্পিউটার হাতে পেলেই সকল ডেটা রিড করতে পারে।

এ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হ’ল কোয়ান্টাম এনক্রিপশন বা কোয়ান্টাম পদ্ধতিতে ডাটা স্টোর করা। এই কম্পিউটার অনিশ্চয়তার নীতির উপর নির্ভর করে ফলে আপনি ফলাফলকে প্রভাবিত না করে কিছু পরিমাপ করতে বা উদ্ধার করতে পারবেন না অর্থাৎ কোয়ান্টাম কম্পিউটার থেকে কোন তথ্য আপনি হাতিয়ে আনলেও তা মূল তথ্যের অনুরূপ হবে না ফলে আপনি চুরি করা পাসওয়ার্ড দিয়ে কারো ব্যাংক একাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার মত কাজ করতে পারবেন না। ন্যাশনাল আইডি সার্ভার থেকে যদি কারো আংগুলের ছাপ বা অনান্য তথ্য হ্যাক করে অন্য কাজে লাগাতে চান তা পারবেন না। কারো কোয়ান্টাম এনক্রিপশন অনুলিপি করা যায়নি বা হ্যাকও করা যায়নি। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সকল তথ্য হ্যাকারদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকবে।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স হচ্ছে বর্তমান সময়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত এবং সম্ভাবনাময় একটি শাখা। এর বৈজ্ঞানিক থিওরিগুলো এতটাই দুর্বোধ্য যে কাউকে পাগল বানাতে চাইলে আপনি তাকে নিঃসন্দেহে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে ছেড়ে দিতে পারেন। এই বিষয়ে কাজ করে দু বারের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী থমাস ফাইনম্যান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন-কি কাজের জন্য আমি নোবেল পেয়েছি তা যদি এত সহজভাবে বলা যেত তাহলে এই পুরষ্কার আমি পেতাম না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি কোয়ান্টাম মেকানিক্স আসলে কেউ বোঝেনা।কোয়ান্টাম কম্পিউটার আবিষ্কারের মাধ্যমে হয়তো মানব সভ্যতা আরও কয়েক শতাব্দী এগিয়ে যাবে। সাথে সাথে খুলে যাবে অপার এক সম্ভাবনার দ্বার যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে রাজত্ব করবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স।টেলিপোর্টেশনের মত তাত্ত্বিক ধারণাগুলো হয়তো বাস্তবায়িত হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের হাত ধরেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Close Menu